দার্জিলিং ভ্রমণ (পর্ব : শেষ)
ইয়াসমিন হোসেন
বিদায় পর্ব :
সকাল ৭টার দিকে হোটেল ছাড়লাম। দিনটি ছিল চমৎকার। রাস্তাঘাটে তেমন একটা লোকজন নেই। আমাদের রিকশা ধীরে সুস্থে এগিয়ে চলেছে। রিকশাওয়ালাকে বলেছিলাম, চ্যারাবান্ধা সীমান্তে যাবো, যেখানে গেলে বাসে উঠতে সুবিধা হয় সেখানেই নিয়ে যেতে। ভেবেছিলাম হয়তো টার্মিনালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু রিকশাওয়ালা বাম দিকে ভিন্ন পথ ধরতেই বললাম, এদিকে কেন? টার্মিনালে যাচ্ছেন না? উনি বললেন, টার্মিনাল থেকে বাসে না ওঠাই ভাল। কারণ ওখানে এ বাসে ও বাসে ওঠানোর জন্য টানাহেঁচড়ার সম্ভাবনা থাকে। তারচেয়ে কিছু দূরে স্টপেজ আছে, সেখানে নিয়ে যাচ্ছি, নিরাপদে উঠে চলে যেতে পারবেন।’ আমি বললাম, রাস্তা থেকে উঠতে গিয়ে সিট পাবো তো? উনি বললেন, পাবেন। কোন সন্দেহ নেই। এতো সকালে গাড়ি ফাঁকা থাকে।
বেশ কিছুদূর যাবার পর স্টপেজে নামিয়ে দেয়া হলো। রিকশাওয়ালা বললেন, একটু অপেক্ষা করতে হবে। টার্মিনাল থেকে সাড়ে ৭টার দিকে গাড়ি ছাড়বে। এখানে এসে যাত্রী নেয়ার জন্য বেশ সময় নিয়ে দাঁড়াবে। আপনাদের কোন সমস্যা হবে না।
ঘড়িতে দেখলাম ১০ মিনিট মতো সময় আছে। পাশে একটা চা-লুচির দোকান দেখলাম। চায়ের অর্ডার দিতে গিয়ে লুচিও নিলাম। আমাদের দেশে ফুটপাতের ধারে যে রকম চায়ের দোকান থাকেÑ এটাও সেরকম। চা-লুচির সঙ্গে আলুর দম। বেশ ভাল লাগলো।
গাড়ি এসে গেল। চালকের সহকারী এসে লাগেজ উঠিয়ে পেছনের বাঙ্কারে ঢুকিয়ে দিলো। আমরা গিয়ে গাড়িতে উঠলাম। অনেক আসনই ফাঁকা ছিল। মিনিট পাঁচেক পর ছাড়লো গাড়ি। তারপর ছুটলো গন্তব্যে।
দু’পাশের বসতি, দোকান-পাট-প্রতিষ্ঠান পেরিয়ে সা সা করে ছুটছিল বাস। দ্রæত চোখের সামেন থেকে বিদায় হচ্ছিল ভারতের মাটি, জনপদ। বাসে বসে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম, আর ভাবছিলামÑ বেড়াতে এসে কি শিক্ষা পেলাম? আমাদের দেশ, সমাজ, রাষ্ট্র এবং জীবন ব্যবস্থার সঙ্গে কী-ই পার্থক্য দেখলাম?
হ্যাঁ, দেখলাম অনেক কিছু। বেশ বড় রকমের পার্থক্যটাই লক্ষ্য করেছি। বাংলাদেশ এবং ভারতের জীবন ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাৎ। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে দিয়ে যদি বাংলাদেশকে বিচার করা যায়Ñ তাহলে চাকচিক্য দেখে মনে হবে না জানি কতো ধনাঢ্য দেশ! গাড়ি-বাড়ি-নগর সজ্জা দেখে মনে হবে রাজকীয় অবস্থা। প্রথম দর্শনে অন্য দেশের যে কেও বিশ্বাস করবেন Ñ দেশটির সবই বুঝি ধন-ধান্যে পরিপূর্ণ! ভারতের একটি ছোট্ট শহর শিলিগুড়ি এর সঙ্গে তুল্যই হতে পারে না। কিন্তু বাস্তবটা পুরো উল্টো। আমাদের দেশে বাহারি চাকচিক্য থাকলেও, কিংবা রাস্তায় অঢেল প্রাইভেট গাড়ির সাম্রাজ্য চোখে পড়লেওÑ জীবন ব্যবস্থায় রয়েছে বড় রকমের ফারাক। রয়েছে চরম বৈষম্য-বৈপরীত্ব। মুষ্টিমেয় ধনাঢ্যের জয়জয়াকারে চারপাশ তরপালেও এখানে রয়েছে বৃহত্তর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দূর্বিসহ জীবন, তাঁদের রয়েছে দু:সহ দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু ভারতে, বিশেষ করে শিলিগুড়ি-দার্জিলিংয়ে এটা নেই। ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা হিসেবে এ সমাজজীবনেও অর্থনৈতিক বৈষম্য আছে ঠিক, কিন্তু তা বাংলাদেশের মতো আকাশ-পাতাল ব্যবধানের নয়। পরিকল্পিতভাবেই এটাকে একটা সুস্থ ধারায় রাখা হয়েছে। যারা সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করেন তারা বৈষম্যটাকে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে আসতে পেরেছেনÑ যাতে সমাজ তার ভারসাম্য না হারায়। সে কারণেই এখানে কোন বেকারত্ব নেই। চুরি-ডাকাতি-ঘুষ-দুর্নীতি-প্রতারণা নেই বললেই চলে। সবাই সৎভাবে কম-বেশি আয় করার সুযোগ পান। আবার যারা বেশি আয় করেন তারাও অনৈতিক পথ মারানোর ক্ষেত্রে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকেন। কারণ সমাজ ও রাষ্ট্র এসবে পৃষ্ঠপোষকতা দেয় না। ভারতের আইন এবং শৃঙ্খলা এতোই কড়া যে বৈধ অর্জনের চেয়ে মোটেও বেশি ব্যয় করার সুযোগ নেই। এটা করলেই সরকার ধরে ফেলবে এবং ইনকাম ট্যাক্স আটকে ফেলবে। আমাদের দেশের মতো যেমন খুঁশি তেমন বেড়ে ওঠার উপায় নেই। চোখের পলকে গাড়ি-বাড়ির-ধন-সম্পত্তির মালিক হয়ে যাবারও সুযোগ নেই। অর্থাৎ গোটা ব্যবস্থাপনাটিই সেখানে নিয়ন্ত্রিত।
ভারতে আইন আছে এবং তার শতভাগ কার্যকারিতা আছে। যা আমাদের দেশে নেই। আমাদের দেশে আইন আছেÑ কিন্তু তার ২/১ ভাগও কার্যকর নয়। নয় বলেই ঘটছে যতো বিপত্তি। আমাদের আইন আছেÑ কিন্তু সে আইন না মানাটাই রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই না মানাটাকে আইনের লোকরাও প্রশ্রয় দেন ঘুষ-দুর্নীতির বিনিময়ে। ফলে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অন্যায়-অবিচার-অনিয়ম-দুর্নীতি কর্তৃত্ব কায়েম করে আছে দোর্দন্ড প্রতাপের সঙ্গে।
খেয়াল করে দেখেছি, শিলিগুড়ি বা দার্জিলিংয়ের কোথাও আইন মেনে চলার জন্য, বা মাদক গ্রহণ না করার জন্য, কিংবা দুর্নীতি-অনিয়মকে Ôনা’ বলার কথা উল্লেখ্য করে কোন সাইনবোর্ড নেই। এগুলো যেন তাদের প্রচার করার প্রয়োজনই হয় না। আইনের কতোটা শক্তিভিত থাকলে এমন সম্ভবÑ তা ভাবলেই বোঝা যায়। আমাদের দেশে প্রচারটাই চোখে পড়ে। বাস্তবে তার প্রতিফলন থাকে না, বা নেই। তাই মানুষের বিবেক-মন-ধ্যান-ধারণায় রয়ে গেছে শুধু অপরাধ আর অপরাধ প্রবণতা। ভারতে অপরাধ করে পার পেয়ে যাবার কোন উপায় নেই। আমাদের দেশে পার পাওয়াটাই স্বাভাবিক রীতি।
আমাদের দেশে যেমন ঘুষ-দুর্নীতি আছে, তেমন আছে নীতি-নৈতিকতাহীনতা। যেখানে সমস্ত কিছু করা হয় মানুষকে ঠকানোর জন্য, প্রতারণা করার জন্য। কোন দোকান থেকে জিনিস কিনবোÑ দোকানী নষ্ট, খারাপ বা বাতিল পণ্যটি গছিয়ে দেবে। যে পণ্যই কিনবোÑ মিথ্য কথা বলে খারাপ জিনিস তুলে বিক্রির কাজটা তারা সেরে ফেলবেন। ফেরত দিতে গেলে নিতে চাইবেন না। দার্জিলিং-শিলিগুড়িতে এসব নেই। শুধু নেই বললে কম করে বলা হয়Ñ ওরা খারাপ জিনিস বিক্রিই করবেন না। কোন কারণে ভুল হলে তার জন্য ক্ষমা তো চাইবেনইÑ ভুল শোধরানোর জন্য যা প্রয়োজন তাই-ই করবেন। আমাদের দেশে মিথ্যা আর প্রতারণা ছাড়া সমাজ জীবন চলেই না। চুরি-ডাকাতি-ছিনতাইসহ বেআইনি কাজটাই যেন মুখ্য। মানুষকে পরিশুদ্ধ করার জন্য ধর্মীয় ভাবেও আছে মসজিদ-মাদ্রাসা থেকে শুরু করে হরেক রকম প্রতিষ্ঠান এবং প্রাতিষ্ঠানিক তৎপরতা। কিন্তু এগুলোও একই চরিত্রের। যে কারণে এর কোনটিই আমাদের সমাজে কোন সুফল দেয় না, ক‚ফল ছাড়া। শো-পিসের মতো সব কেবল শোভা বর্ধন করছে, আর এগুলো থেকে ব্যবসায়িক ফায়দা লুটছে সমাজের প্রতারক শ্রেণি।
শিলিগুড়ি বা দার্জিলিং শহরের চাকচিক্য জৌলুস আহামরি কিছু নয়। তবে এখানে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষযটিই ঠিকমত গড়ে উঠেছে। যা সমাজের একেবারে গভীর পর্যন্ত প্রথিত। এখানে গড়ে উঠেছে মানুষের নীতিনৈতিকতা, দেশপ্রেম, মানবপ্রেম এবং আর্থ-সামাজিক দিক থেকে আত্মনির্ভরশীলতার অহং। এইরকম অহং থাকার কারণেই মানুষের মাঝে আজ এতো ধীরতা-স্থিরতা-শান্তি এবং সহনশীলতা।
এইসব মানুষের অকল্পনীয় সুস্থতা দেখে একটু অন্যভাবে ভাবতেও চেষ্টা করছিলাম। কী করে এখানকার মানুষ এতো সহনশীল হয়? শীত প্রধান এলাকা বলে কি এই ধীরতা-স্থিরতা-সহনশীলতা? আমাদের দেশের মানুষ প্রখর গরমে বাস করেন। এরজন্যই কি আমাদের দেহ-মন এতো রুক্ষ, অসহনশীল, অস্থির, অশান্ত? আমি নিজেও এ থেকে মুক্ত নই। আমার চারপাশে যারা সবাই এক ধরণের অসহিঞ্চু, অস্থির এবং অশান্ততায় ভোগেন। বায়ুমন্ডলের উষ্মতাই কি এর মূলে?
আমার কাছে তা মনে হলো না। এখানে বেড়াতে এসে মনে হচ্ছেÑ এর পেছনে অন্য কারণটাই মূল। আর্থ-সামাজিক বৈষম্য এবং মানুষের না পাওয়ার তিক্ততা থেকেই আমাদের দেশে জন্ম নিয়েছে যতো অস্থিরতা-অসহিঞ্চুতা। কারণের ভেতর আরও আছে অনিয়ম-অবিচার এবং অবিরাম শোষিত-বঞ্চিত হওয়ার জ্বালা-যন্ত্রণা। যার ফলশ্রæতিতে জন্ম নিয়েছে একে-অপরকে ঠকিয়ে, কিংবা দুর্নীতি-লুটপাট করে যেনতেন বেড়ে ওঠার প্রবণতা। এ পৈশাচিক প্রবণতা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শক্ত আসন করে আছে। ফলে জিনগতভাবেও আমাদের মাঝে তৈরি হয়ে চলেছে লুণ্ঠক ও প্রতারক মানসিকতা। সংস্কৃতিগত-সমাজগত এবং আর্থ-রাজনৈতিকভাবে যাদের এগুলো দেখার কথা, যাদের দ্বারা রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে এগুলো নির্মূল হবার কথাÑ তারাও এখানে নিরব, নিষ্ক্রীয় ভূমিকা পালন করছেন। অর্থাৎ এক ধরণের দায়িত্বহীনতায় ধ্বংস হচ্ছে আমাদের সমাজ এবং সামজিক-মানবিক গুনাবলী।
ভাবছিলামÑ আজ থেকে ৪২ বছর আগে ১৯৭১-এ ভারত কোন্ অবস্থায় ছিল, আর আমাদের অবস্থা কি ছিল। তখন ভারত ছিল অর্থনৈতিক দিক থেকে একেবারেই অনুন্নত, অনগ্রসর গরীব একটি দেশ। তাদের গর্ব করার মতো কোন উৎপাদন ব্যবস্থাই ছিল না। তখন ওদের তৈরি যে সব জিনিসপত্র তখন স্বাধীন বাংলাদেশে আসতোÑ তা একেবারেই নিম্নমানের। সাবান, বেøড, বিস্কুট, খাদ্য, প্রসাধনী সামগ্রি, কাপড়-চোপড় ইত্যাদি এতোই খারাপমানের ছিলÑ যা আমাদের দেশের মানুষ কখনই ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন না। এমনকি স্বাধীনতার ২০ বছর পরেও দেখেছি আমাদের দেশের চোরাচালানিরা ভারতে পাচার করতো ইলেক্ট্রনিক্স জিনিপত্র, কাপড় ইত্যাদি। সেগুলোর কী ভয়ানক চাহিদা ছিল ভারতে। কারণ তারা ওসব তৈরি করা জানতো না। ১০ বছর আগেও দেখেছি আমাদের দেশের পণ্য বিজ্ঞাপন, টিভি নাটকের ধারে কাছেও ছিল না ভারত। অথচ কতো দ্রæত তারা আমাদেরকে ছাড়িয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে উপরে উঠে গেছে। ভারত আজ আর্থ-রাজনৈতিকভাবে পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। কী পরিমান দায়িত্বশীলতা থাকলেই না এটা সম্ভব!
এক সময় ভারতের মানুষ এতো গরীব এবং এতো অভাব নিয়ে চলতেন যেÑ হা-ভাতের মতো তাদের অবস্থা ছিল। সকাল বেলা একটি রুটি দিয়ে নাস্তা, দুপুরে মুড়ি খেয়ে লাঞ্চ, আর রাতে কোন রকমে অল্প ভাত বা রুটি খেয়ে জীবনধারণ। এমনকি বেশিরভাগ মানুষই তিন বেলা আহার পেতেন না। আর তখন বাংলাদেশের মানুষের খাওয়া এবং অন্যান্য খরচ দেখে তারা হাঁ করে কেবল চেয়ে থাকতেন।
কিন্তু আজ ভারতের যে একাংশকে দেখলামÑ তা কল্পনাও করা যায় না। তারা আমাদেরকে ছাড়িয়ে উন্নয়নের অনেক অনেক গুন উপরে উঠে গেছে। মেধা, আত্মত্যাগ এবং কঠোর পরিশ্রমের মধ্যদিয়ে এটা সম্ভব হয়েছে। সম্ভব হয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের দেশপ্রেমিক মানসিকতার ফলে। তাদের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক দিক দিয়েই হয়নি, সামাজিক-আইনশৃঙ্খলা-জীবন ব্যবস্থা-দায়দায়িত্বশীলতাসহ সমস্ত ক্ষেত্রেই হয়েছে। আর আমরা পড়ে গেছি পেছনে। আজ আমরাই ভারত থেকে সংগ্রহ করছি ইলেক্ট্রনিক্স জিনিসপত্র, কাপড়, কসমেটিক্স থেকে শুরু করে সমস্ত রকম পণ্য সামগ্রী। ভারত সব ক্ষেত্রে পর্বতসম উপরে উঠে গেছে এবং আরও উপরে উঠছেই। আর আমরা রাষ্ট্র ও সমাজের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত হিংসা-বিদ্বেষ-হানাহানি-জিঘাংসা-দুর্নীতি, প্রতারণা, চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই, জবরদস্তি-দখল, লুটপাট, খুন, রাহাজানি আর রাজনীতির নামে দেশ ধ্বংসের মহাযজ্ঞে লিপ্ত রয়েছি।
ভাবছিলাম, দার্জিলিং এবং শিলিগুড়ির যে আলোকিত রুপÑ তার সঙ্গে আমাদের দেশকে তুলনা করতে গেলে নিজেকেই মহা-হীনতায় ফেলে দিতে হয়। এটা আমাদের দেশের জন্য দারুণ অবমাননাকর, লজ্জাস্কর। এই লজ্জার কথা কি বলা বা লেখা উচিৎ? নাকি মিথ্যেভাবে বলা উচিৎ, ‘ভারতের মানুষ খুব গরিব, কৃপণ, ট্রেনে তুলে দিয়ে ওরা বলে দাদা দুপুরের খাওয়াটা খেয়ে গেলে হতো না? এইসব বলে সত্যটা আড়াল করে আমরা কি আত্মতুষ্টিতে ভুগবো? আর এটায় কি সত্যিই আমাদের জন্য কোন সুফল এনে দেবে? নাকি সত্যটা বলে নিজেদের আসল অবস্থাটা বিবেচনার জন্য তুলে ধরাটাই হবে নৈতিক দায়িত্ব?
আমার কাছে মনে হলো, সত্যটাই আমাদের চোখ খুলে দিতে পারে। সত্যই আমাদের অগ্রযাত্রার পাথেয় হতে পারে। যারা সত্যকে লুকানোর জন্য মিথ্যার আশ্রয় নেবেনÑ তারা শুধু নিজের সঙ্গেই প্রতারণা করবেন না, দেশ ও জাতির সঙ্গেও প্রতারণা করে মিথ্যা প্রবোধ দিয়ে বাংলাদেশকে অন্ধকারে ডুবিয়ে রাখবেন। ক্ষতি করবেন মাটি ও মানুষের। আমি কখনই এটা চাই না, চাইতে পারি না।
একটা বিষয় পরিস্কার সেটা হলোÑ আমাদের দেশটা অর্থনৈতিক দিক থেকে এমনই বাণিজ্যিক পর্যায়ে চলে গেছে যে, এখানে বাণিজ্যিক নীতিটাই আসল। মানব সেবার বদলে যেনতেন প্রকারে ব্যবসা করাটাই এখানকার বাণিজ্যের ধর্ম। এই বাণিজ্যিক নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জন্ম দিয়েছে ব্যক্তিস্বার্থ। দেশপ্রেম, মানবপ্রেম নির্মূল করেছে এই সাম্যাজ্যবাদী ধনতান্ত্রিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা। যদিও ভারতের অর্থনীতিও ধনতান্ত্রিক। তবে আমাদের দেশের মতো সে দেশকে এতো অধ:পাতে নামতে দেয়া হয়নি। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে অধ:পাত। ফলে আমাদের সঙ্গে তাদের একটা বড় মাত্রায় তফাৎ তৈরি হয়েছে।
মনে হচ্ছিল, আমাদের জন্য এমন একটা দেশ পেতামÑ যেখানে শান্তি আছে, স্বস্তি আছে, আছে মানুষ হিসেবে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা, তাহলে কতো না স্বস্তি মিলতো। আমরাও যদি ভারতের মতো সমাজব্যবস্থায় নূন্যতম একটা নৈতিকতা গড়ে তুলতে পারতামÑ তবুও একটা স্বস্তি ছিল। স্বস্তির সমাজে বাস করতে পারলে সুস্থ হয়ে উঠতে পারতাম মন ও মানসিকতায়। কিন্তু পারি না। কারণ আমাদের সমাজ চরিত্র এতোটাই দুষিত যেÑ এখানে সুস্থ সমাজের মানুষ এসেও অসুস্থ হয়ে পড়বেন। যেমন বাংলাদেশে ভারতীয় দূতাবাসে কর্মরত ইন্ডিয়ান কর্মিদের খেয়াল করলেই এটা পরিস্কার হয়ে যায়। কারণ এই দেশে অবস্থান করে তারাও সুস্থতা হারিয়ে ফেলেছেন। সে কারণেই দূতাবাস বা ভিসা সেন্টারগুলোতে কর্মরত ভারতীয়দের বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।
আমাদের বাস চলে এসেছিল চ্যারাবান্ধা যাবার বাইপাসে। দ্রæত নেমে পড়তে হলো। এরপর রওনা হলাম রিকশাভ্যানে। এরইমধ্যে মোবাইলের সিম পাল্টে নিয়েছি। ঘড়ির সময় আধাঘণ্টা এগিয়ে দিয়েছি।
নির্ঝঞ্ছাটে ইমিগ্রেশনে পার হয়ে বাংলাদেশে মাটিতে পা দিয়েই বিদায় জানালাম অভিজ্ঞতার দিগন্তকে। বিদায় শিলিগুড়ি, বিদায় দার্জিলিং, বিদায় ভারত। মনে মনে বললাম, এ দেখাই শেষ দেখা নয়.....।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Thanks for Message